রবিবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৯, ০৭:০০ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
চলে গেলেন কবি আল-মাহমুদ জুড়ীতে উপজেলা নির্বাচনে সতন্ত্র প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা মোঈদ ফারুকের মতবিনিময় সভা পরিনত হলো বিশাল জনসভায়। প্রশিক্ষণার্থীদের সনদপত্র প্রদান করল জুড়ীর হেক্সাস জুড়ীতে উপজেলা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন, মুক্তিযোদ্ধা এম, এ, মুঈদ ফারুক ইজতেমার কারণে এসএসসির তিন বিষয়ের পরীক্ষা পিছিয়েছে উপজেলা নির্বাচনে মৌলভীবাজারে নৌকার প্রার্থী যারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তনঃ উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীরা পাবেন নৌকা ক্যান্সার আক্রান্ত মায়ের চিকিৎসায় সহযোগিতা চান যুবলীগনেতা চাম্পা ইউরোপ প্রবাসী সুলতান আহমদের বিরুদ্ধে অপ-প্রচার প্রতিদিন একটি ডিম খান হৃদরোগের ঝুঁকি কমান
অরিত্রির আত্নহত্যাঃ একটি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

অরিত্রির আত্নহত্যাঃ একটি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

ডাঃ রফিকুল ইসলাম

পিতার কাধে সন্তানের লাশ, এর চাইতে ভারী বস্তু দুনিয়ার বুকে আর কিছুই হতে পারে না। অরিত্রিকে হারিয়ে তার বাবা-মা যা হারিয়েছেন তা আর কোনদিন পূরন হবার নয়। তাদের কস্ট বা বেদনা অন্য কেউ দূর করে দিতে পারবেন বলেও মনে করিনা। এটুকু প্রার্থনা মহান আল্লাহ্‌ যেন তাদের সন্তান হারানোর এই বেদনা সহ্য করবার মত শক্তি দেন। অরিত্রির আত্নার শান্তি কামনা করছি।

হুজুগের স্বভাব এখন খুবই প্রকট আকার ধারন করেছে। কিছু একটা হলেই আন্দোলন, দাবি আর তার বাস্তবায়ন না দেখা পর্যন্ত যেন পেটের ভাত হজম হবে না। অরিত্রির আত্নহননের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক রকম তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। টিভি মিডিয়ার সামনে কিছু কিছু অভিভাবক অতি আবেগের তোড়ে অভিযোগ তুলে এমন সব তথ্য প্রকাশ করছেন যা হয়তো অনেকেই জানতেন না। কিন্তু এটা সত্য যে সেই সব অভিযোগ, যন্ত্রনা, ঝামেলা, অন্যায়, অনিয়ম বুঝেই তারা তাদের কন্যাদের ভিকারুননিসা নূনের মত স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। ডোনেশন এর নামে লাখ লাখ টাকার বানিজ্য’র কথা সবাই জানি। মেনেও নিয়েছিলেন কিন্তু প্রকাশ করেন নি, কিম্বা এই বানিজ্যে নিজেকে চুপে চুপে জড়িয়েছেন। কিন্তু বছর শেষে ঠিকই লাখ লাখ টাকার বান্ডিল নিয়ে যথা মাধ্যমে, যথা সময়ে নিজ কন্যার আসনটি ভিকারুননিসা নূনে নিশ্চিত করতে ঘুমও হারাম করেছেন এটাও সত্য।

অরিত্রি আমার কন্যাসম। অরিত্রির জন্য দুঃখ, সমবেদনা এবং ভালোবাসা।

কিন্তু আমরা এখন যা করছি তা কতটুকু বিজ্ঞান ও আইন সম্মত?
মনোবিজ্ঞান বলে, “মানব সভ্যতার আধুনিকতাই জীবনের জটিলতার সৃষ্টি করে। এই জটিলতাই জন্ম দেয় বিভিন্ন হতাশার। সৃষ্ট হতাশাবোধ মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন পথ ধরে আত্নহত্যা করার ইচ্ছার জন্ম দেয়। কেউ বা মনে করে সে নিজে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেই সমস্ত হতাশার সমাপ্তি ঘটবে। পারিবারিক, সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্ত বিরোধ মিটে যাবে। এমন কি প্রতিশোধ পরায়ণ মানসিকতা থেকেও আত্নহত্যার প্রবণতা নিজের মধ্যে জন্মাতে থাকে। কিংবা আত্নহত্যা করলে তার দায়বদ্ধ্যতা কমে যাবে”।

সাধারনের দৃষ্টিতে অরিত্রির ঘটনায় নকল করা ছিল সামান্য অপরাধ। কিন্তু ভিকারুননিসায় যতগুলো নিয়মের কথা বলা আছে তার মধ্যে সবচাইতে কঠিন নিয়ম হলো ব্যাগে বা নিজের কাছে কোনো ডিভাইস, মোবাইল, ক্যামেরা ইত্যাদি ইলেকট্রনিক্স সামগ্রি রাখা আর সেই জন্য যে শাস্তির বর্ণনা আছে (টি সি দিয়ে বের করে দেয়া) যা ভর্তির সময় ছাত্রীদের ও অভিভাবকদের লিখিত আকারে দেয়া হয়। আর সেই কঠিন নিয়ম মানতে বাধ্য থাকতে হয় জেনেই সবাই মেয়েকে ভিকারুননিসা নূনে পড়াতে চান। অথচ জীবন দিয়ে অরিত্রি সেই নিয়মের কথাই আবার সবাইকে মনে করিয়ে দিয়ে গেলেন। কিন্তু অরিত্রির অভিভাবকদের এই বিষয়ে যথেস্ট সচেতনাতর অভাব ছিল বলেই মনে করি।

শিক্ষক নকলের অপরাধে তাকে বহিস্কার করতে পারতেন। ঠিক, কিন্তু নকল কি কাগজে ছিল? অন্যের খাতা দেখে লিখছিল। না। টি সি’র প্রসঙ্গ এসেছে সম্ভবত মোবাইলের জন্য। আর সেই প্রসঙ্গ ধরে যখন শিক্ষক পিতাকে ডেকে অপমান করলেন, হয়তো মেয়ে সেই অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্নহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু যদি আপনি ভাবতে চান যে, অপমানের মাত্রা এত বেশি ছিল যা অভিভাবক হিসেবে অরিত্রির পিতা সেই অপমান নিজেই সহ্য করতে পারেন নি। তাই তিনি নিজেই অরিত্রিকে অতিমাত্রায় বকা, গালমন্দ করেছেন কিম্বা বাসায় এনে শারীরিক টর্চার করেছেন। অথবা মোবাইল কেড়ে নিয়েছেন। কিম্বা অন্য কিছু অতিমাত্রিক কোনো ঘটনা যা অরিত্রির পক্ষে সহ্য করার মত ছিলনা। এটি অনুমান, হতে পারে, নাও হতে পারে। এর কোনো প্রমাণ কারো কাছে নেই। আর এমন ঘটনা ঘটলেও অরিত্রির পিতা স্বীকার করবেন না।

জনস্বাস্থ্যের শিক্ষক হিসেবে এবার একটু অন্য ভাবনা। সবকিছুর জন্য অন্যকে আগে দোষারূপ করা আমাদের মজ্জাগত স্বভাবে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন শিক্ষক দায়ী, কারন হিসেবে যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন শিক্ষকের কাছ থেকেই সন্তানরা ৯০% শিক্ষা গ্রহন করে থাকেন। আমি বলবো না। যুগের সাথে, সময়ের সাথে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে যা মেনে নিতে হবে। আমাদের সময়ে ক্লাসে এমন কি পুরো স্কুলেই সকল শিক্ষক আমাদের বাই-নেইমে চিনতো। কারন সংখ্যায় কম ছিলাম। এখন এক এক ক্লাসে হাজারের উপরে স্টুডেন্ট। বাহারি হরেক নামে এ টু জেড পর্যন্ত শাখা আছে একই ক্লাসে। শিক্ষক ক্লাসে পড়ানো বাদে এখন আর অন্য খবর নিতে চান না কিম্বা পারেন না ছেলে-মেয়েরা লেখা পড়ার বাইরে আর কি অসুবিধায় ভোগেন। সত্যিকারের কি অসুবিধায় কাল কিম্বা গত কয়েকদিন তার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রী ক্লাসে আসেন নি। কারো সুখ-দুঃখের সাথি হবার এখন সময় নেই, যেটি আগে ছিল। এটি রুড বাস্তবতা। তাই বলে আমি আমার সন্তানেকে সকল শিক্ষার জন্য বানিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করতে পারি না। ৯০% শিক্ষাই সে স্কুল-কলেজ থেকে বা শিক্ষকের কাছ থেকে নিবেন এটা এখন সত্যের অপলাপ। পিতা-মাতা তথা পরিবারের শিক্ষার নিয়ামকটাই হলো আসল। এখানেই অরিত্রির পিতা-মাতা ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের নার্ভ খুব দুর্বল ছিল, আর ছিল বলেই তারা অরিত্রিকে রক্ষা করতে পারেন নি।

এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে। আমি আগেই বলেছি অরিত্রির জন্য দুঃখ আর ভালোবাসা আছে। এক অরিত্রিকে আত্নহননের পথে ঠেলে দিয়ে পরের কাজ গুলো কি এখন যথাযথ হচ্ছে? পরোক্ষভাবে যদি এতে শ্রেণী শিক্ষক বা অন্যরা দায়ী হয়ে থাকেন দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার হবে। কিন্তু একই ঘটনার পুনঃজন্ম দিলে তা কি আরো ভয়ানক নয়? গত ৬ ডিসেম্বর রাতে ভিকারুননিসার শিক্ষক হাসনাহেনাকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। সেই ছবি কালের কন্ঠ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণের সুবাদে সোসাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। আমার বিশ্বাস সেই ছবি অনেকেই দেখেছি। তাকে চাকরিচ্যুত করা, এমপিও কেড়ে নেয়া, মামলা করে গ্রেফতার। একজন শিক্ষকের এই অবস্থা দেখার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। সমাজ এই ঘটনা থেকে ভুল ম্যাসেজ পেয়ে গেলো যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য এই ক্ষত বয়ে বেড়াতে হবে।

তাকে এভাবে সমাজের সামনে হেয় করার আগে একটিবার কেনো আমরা ভাবলাম না যে, এই হাসনাহেনা ম্যাডাম একজন মানুষ, একজন নারী, তারও সন্তান আছে, তারাও স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। কেনো ভাবা হলো না যে, সে কারো স্ত্রী, কারো বোন, কারোবা আদরের কন্যা। সেও একজন শিক্ষক হিসেবে সমাজে বাস করে। এক বা একাধিক ব্যক্তির পরোক্ষ ভুলের জন্য এবার কতজনকে আমরা প্রতক্ষভাবে আত্নহননে বাধ্য করছি।

দোষ কি নির্দোষ তা আদালত প্রমাণ করবে। কিন্তু কাল ৭ ডিসেম্বর দুপুরে ভিকারুননিসার সামনে দিয়ে যখন বেইলিরোডে আসি তখন উল্টো চিত্রও দেখলাম। সেখানে ছাত্রীরা জড়ো হয়ে স্লোগান দিচ্ছে, তাদের প্রিয় হাসনা আপার মুক্তি চায়। রাতে ফেসবুকেও দেখেছি একটি ভিডিও যাতে ছাত্রীরা তাদের হাসনা আপার মুক্তির জন্য আন্দোলন করবে। সেই ছাত্রী এখানে ১১ বছর লেখা পড়া করে, ইতিপূর্বে তার তিন বোনও এখান থেকেই পাশ করেছে। তার মতে হাসনা আপা একজন ভালো মানুষ, একজন ভালো শিক্ষকও বটে।

নিজের অভিজ্ঞতাও খুব সুখের নয় স্কুল কলেজ নিয়ে। অভিভাবক হিসেবে ঢাকা কলেজে গিয়ে আসামির মত দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে ছেলের চুল বড়, যদিও চুল কতটুকু থাকবে তার কোনো মাপকাঠি দেয় নি বা ছিল না। এক সপ্তাহে তিন বার ছেলের চুল কাটাতে বাধ্য করেছে ঢাকা কলেজ। তীব্র শৈত্য প্রবাহেও কলেজের পোশাক ছাড়া অন্য কোনো পোশাক পরতে দেয় নি। পরে গেলেও খুলে রেখে দিয়েছে যা আর ফেরত পাওয়া যায়নি। আই-ফোন হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙ্গে কলেজের পুকুরে ফেলেছে। সামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজও কম যায় না। একজন পড়িয়েছি আরেকজন পড়ছে। সে প্রসংগে আরেকদিন লিখবো।

অনেক রকম ত্রুটি বা ভুল স্কুল-কলেজ বা তাদের প্রশাসন করেন তবুও আমরা তাদের পিছনেই ছুটি কারন আমার প্রয়োজন। সকল নিয়ম তা যত কঠিনই হোক মেনে নিব বলেই সন্তাকে তাদেরকাছে দিয়েছি। দিন শেষে আবার তাদের কাছেই যেতে হবে। কারন মানুষ হিসেবে একার পক্ষে আমার সব কিছুই করা সম্ভব নয়। সমাজ ব্যবস্থায় অন্যদেরও কাজ ও দায় আছে।

ইচ্ছে করলেই একদিনে সব অনিয়ম নিয়মে পরিনত করা সম্ভব নয়। আর যাকে আমরা অনিয়ম বলছি তা আমাদের নিষ্ক্রিয়তার ফলেই আজ নিয়মে রূপান্তরিত। আমার স্বার্থ আগে, তাই চুপি চুপি অনেক অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়ে কাজ উদ্ধার করেছি। না হলে আজ ১০ লাখ টাকার ডোনেশন শব্দটাই শোনা যেত না। সহজে পরিবর্তন তা সুদূর পরাহত। কারন স্বার্থ সবাই চুপি চুপি উদ্ধার করে। মেনে নিয়ে নিজেকে যত দ্রুত পরিবর্তন করতে পারবো সমাজের জন্য ততই মঙ্গল। নিজে পরিবর্তন হলেই কেবল সমাজ পরিবর্তনের কথা ভাবা যায়, নচেৎ নয়।

এটুকু মনে রাখা জরুরি যে, শুধু প্রয়োজন বলেই আমি আমার সন্তানকে সব কিছুর জন্য বাণিজ্যিক পন্য বানাবো না। তাদের মানসিক বিকাশে পিতা-মাতা হিসেবে আমারও দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। কতটুকু নেগেটিভ চাপ সে সহ্য করবে আমাকে সেইটাও ভাবনায় নিতে হবে।

আরেকটি কথা না বললেই নয়, সবার আগে নিজেকে ভালোবাসি, পরিবারকে ভালোবাসি, তাদের কথা ভেবেই নিজেক গড়ে তুলি। আত্নহননে কোনো সমাধান নেই।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




All rights reserved: moulvibazartimes.com
Design & Developed BY Popular-IT.Com